মহারাষ্ট্র পুরাণ
সমকালীন ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল যে গ্রন্থে, তার নাম ‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’ বা ‘ভাস্কর পরাভব’ । বর্গীর হাঙ্গামা উপলক্ষে রচিত
‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’ মধ্যযুগের একখানি ঐতিহাসিক কাব্য । ভাস্কর পন্ডিত তিন বার বাংলাদেশ আক্রমণ করেন । বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে
হানার অমানুষিক অত্যাচারের নির্মম বর্ণনা এই কাব্যে পাওয়া যাবে। কাব্যটির রচয়িতা
গঙ্গারাম দেব । এই গ্রন্থ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে দেবেশ কুমার আচার্য্য বলেছেন
-
গঙ্গারামের বিস্ময়কর ঐতিহাসিক তথ্য - দৃষ্টি, বাস্তব জীবনবোধ, মানবিক সহমর্মিতা ও নৈতিকতার দিক থেকে 'মহারাষ্ট্রপুরাণ' বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের শেষ প্রান্তে নবজীবন চেতনার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা বলা যেতে পারে ।
গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ-এর আবিষ্কার -
বাংলা ১৩১১ বঙ্গাব্দে মৈমনসিংহের কৃষিশিল্প প্রদর্শনীতে
‘সৌরভ’ সম্পাদক কেদারনাথ মজুমদার এই কাব্যের পুঁথি সম্পর্কে প্রথম পরিচয় দেন।
কাব্যটির রচনাকাল ১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দ । ময়মনসিংহে আঞ্চলিক কবিদের জীবনী সংগ্রহ করার
সময় ‘সৌরভ’ পত্রকার সম্পাদক কেদারনাথ মজুমদার তালপাতার পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কার
করেন । 1908 সালে,
ব্যোমকেশ মুস্তাফি লেখাটি সম্পাদনা করেন । সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় একটি ভূমিকা ও সাথে
নোটসহ কাব্যটি প্রকাশিত হয়েছিল ।
কবি পরিচিতি -
কেদারনাথ দত্তের দেওয়া
তথ্য থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম
দিকে কিশোরগঞ্জ মহকুমার ধরীশ্বর গ্রামে
কবির জন্ম হয়। তাঁর কৌলিক উপাধি ছিল দেব । তার প্রপিতামহের নাম হরিশ্বর দেব ।
জঙ্গলবাড়ীর মুসলমান জমিদারের সেরেস্তার উচ্চপদাধিকারী কর্মচারীরূপে উপাধি
পান ‘চৌধুরী’। এই জন্য অনেকে গঙ্গারাম চৌধুরী এই নামও উল্লেখ করেছেন । ব্যোমকেশ মুস্তাফীর মতে, কবি গঙ্গারাম রাঢ় অঞ্চলের কবি । ।
অধ্যাপক রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় যশোহর নড়াইলের এক অখ্যাত কবি গঙ্গারাম
দত্তকে মহারাষ্ট্রপুরাণের রচয়িতার বলে মনে করেন । মধ্যযুগের বিভিন্ন রচনার মতো
গঙ্গারাম এর সম্পর্কেও সর্বজন মান্য প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি ।
কাব্যের রচনাকাল -
কাব্যের রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় যে কাব্যটি রচিত হয় ১৭৫১
খ্রীস্টাব্দের ১৯শে বৈশাখ (১১৪৯ বঙ্গাব্দ) ।
“বৈশাখের উনিশায় বর্গী আইলা তায়
মহা আনন্দিত হৈয়া মনে।”
“ইতি মহারাষ্ট্রপুরাণে প্রথম কাণ্ডে ভাস্করপরাভব শকাব্দ ১৬৭২ সন ১১৫৮ সাল তারিখ ১৪ই পৌষ রোজ শনিবার” । অর্থাৎ এই কাব্য ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়। বাংলাদেশে বর্গীর উৎপাতের সময়সীমা ১৭৪২ থেকে ১৭৪৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত । বর্গীরা বাংলাদেশ আক্রমণ করে তিনবার - ১৭৪২, ১৭৪৩, ১৭৪৪ খ্রীস্টাব্দ। বাংলাদেশের সিংহাসনে তখন সুলতান আলিবর্দি।
কাব্যটির প্রথম কাণ্ডের নাম ‘ভাস্কর পরাভব’। সম্ভবত অন্য কাণ্ড আর লেখা হয়নি। এই গ্রন্থের রচনা ভঙ্গী গদ্যাত্মক, ওড়িয়া কবি ব্রজনাথ বড়জেনার ‘সমরতরঙ্গ’এর মতো কাব্যিক নয়। তবু এ বিবরণের উৎস যে রাজকর্মচারী গঙ্গারামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাজনিত ফলশ্রুতি, তা কোন ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। একথা ঠিক, কাব্যরসিকের আগ্রহ এ গ্রন্থ মেটায় না, একালের সতর্ক ইতিহাস পাঠকও দু-একটি তথ্যচ্যুতি হয়ত খুঁজে পাবেন, তবু মহারাষ্ট্রপুরাণে’র প্রত্যক্ষদ্রষ্টা স্রষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।
বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বঃ -
(১) 'মহারাষ্ট্রপুরাণ'
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য একমাত্র ইতিহাস সমৃদ্ধ কাব্য ।
(২) সমকালীন ঐতিহাসের বীভৎস নারকীয় কাহিনীকে নিপুণ তথ্য আছে কাব্যটিতে ।
(৩) গঙ্গারাম কাব্যটিকে 'প্রথমকান্ড ভাস্কর পরাভব' নাম দিয়েছিলেন।
(৪) গঙ্গারাম যুগের চাহিদা মেনে পুরাণ ও মঙ্গলকাব্যের ধাঁচে এই ঐতিহাসিক
কাব্যটি রচনা করেন।
(৫) এই কাব্যের মধ্য দিয়ে গঙ্গারাম মধ্যযুগে এক নতুন কাব্য ধারা সৃষ্টির
প্রচেষ্টা করেন।